কুকুরকার্ফু

কুকুরকার্ফু

ডি. অমিতাভ

শহরটা পাশব উত্তেজনার লাভাস্রোতে ফুটছে। পাঁচ বছরে এতটা বদলে গেল শহরটা। না ভূমিকম্প বা দাঙ্গায় শহরটা ভেঙ্গে পড়েনি। মানচিত্র মাফিক ভূগোল একদম ঠিকঠাক। বন্যার পলি মাটিও চাপা দেয়নি শহরের জমি জায়গা। শুধু মানবজমিন বদলে গেছে। শহরটার এগলি ওগলি দিয়ে হু হু করছে ফাঁকা বাতাস নি:শব্দে। ল্যাম্পপোস্টে আলো আছে, ট্যাপ কলে জল আছে, রাস্তায় গাড়ি আছে অল্প বিস্তর। তবু কল্লোলিনী কলকাতার প্রাণ বায়ু কারা যেন শুষে নিয়েছে। সুনসান শহরে মানুষের মিছিল আনাগোনা কবে অতীত হয়ে গেছে। শহরটা খাঁচার মতো বন্ধ লাগছে। যাদের কোথাও যাওয়ার নেই তেমন মানুষই আছে খাঁচাবন্দি বাড়িগুলোয়। বেশির ভাগ মানুষ কোলকাতা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। পালাতে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে দলদল মানুষ।

পৃথিবীর ইতিহাসে এমনটা আগে ঘটেছে কিনা জানা নেই। একটা শহর প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যুদ্ধ বা দাঙ্গা ব্যতীত এমন ছমছম রক্তদাগ মেখে মৃতপ্রায় শুয়ে থাকতে পারে কোলকাতাকে না দেখলে কেউ অনুমান করতে পারবে না। অথচ শুরুটা হয়েছিল আমার কাছে সামান্য ভাবেই। তখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। বরাবরই হোস্টেলে থাকি। যখন হোস্টেলে থাকি তখন বাড়ির কথা খুব মনে পড়ে। মায়ের পাশে শুয়ে মায়ের গন্ধ নিয়ে ঘুমতে ইচ্ছা করে। আবার যখন বাড়িতে স্কুলের ছুটিতে আসি, মা-বাবা অফিসে চলে গেলে মনে মনে হোস্টেলের বন্ধুদের কাছে ফিরে যাই। সেবার গরমের ছুটি বেড়ে গেছে অনেকটা। অতিরিক্ত গরম। আমার আর কিছুতেই বাড়িতে ভালোলাগছে না। বাড়িতে এসির ম্যাদম্যাদে ঠাণ্ডার থেকে হোস্টেলের পুকুরে বন্ধুদের সঙ্গে জল মাখার আনন্দই আলাদা।

বাবা মার দুজনেরই বড় চাকরি। বাবার রোজই ফিরতে দেরী হয়। মাঝে মাঝে মারও। সে বছর ভোট ছিল কিছু একটা। মাও সেদিন দেরী করছিল খুব। ফোন করতে বলল, রঙ্গিন, আজ ইলেকশন নিয়ে ইম্পরট্যান্ট মিটিং আছে। ফিরতে একটু দেরি হবে।

সেই “একটু দেরি টা” দশটা পার হতে আমি ঘরের টিভি, এসি, আলো বন্ধ করে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। আমার ঘরের বারান্দায় সাধারণত আমরা যাই না। গলির দিক এদিকটা। একটা আবর্জনা ফেলার ভ্যাট আছে। বাবা মা বড় চাকুরে হয়েও, ধরা করা করেও ভ্যাটটা সরাতে পারেনি। জি প্লাস ফোর বিল্ডিংএর তিনতলায় আমাদের ফ্ল্যাট। তবু গন্ধটা ডাস্টবিন থেকে নাকে ধাক্কা মারে সজোরে। এতো বছরেও গন্ধটা সইয়ে নিতে পারিনি আমরা কেউই।

বাব মা বা আমার রাগ হলে আমার ঘরের বারান্দায় দাঁড়াই। দুর্গন্ধে দাঁড়িয়ে থেকে নিজেকে শাস্তি দিই অভিমানের অভিযোগে। আমাদের বিল্ডিংএর কেউই এদিকের বারান্দাগুলো ব্যবহার করে না। ভ্যাটটার জন্য এদিকটা কেমন স্যাঁতস্যাঁতে লাগে। আমি বাবা-মার উপর অভিমান করে দাঁড়িয়ে রইলাম বারান্দায়। কতক্ষণ কে জানে। হঠাৎ দেখলাম আমাদের পাশের গলির বাপিদা ব্যাগে করে কিছু এনেছে ভ্যাটে ফেলার জন্য। আমি গুরুত্ব দিলাম না। কিন্তু একটা ব্যাপারে খটকা লাগল। বাপিদার গলিতেও তো ভ্যাট আছে ! বাপিদার ব্যাগ অমন উথাল পাথাল নড়ছে কেন ? আমি বারান্দার দেওয়াল ঘেঁসে লুকিয়ে গেলাম।

}{ ২ }{

আমি আবার ফিরলাম পূজার ছুটিতে। তখন আর মনে ছিল না বাপিদার ঘটনাটা। পরের গ্রীষ্মের ছুটিতে আমার আর কোলকাতায় ফেরা হয়নি। নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন থেকে আমাদের সামার ক্যাম্পে নিয়ে যায় দার্জিলিং জেলার মিরিকে। বাড়ি ফিরলাম পূজার ছুটিতে।

পূজার ছুটিতে বাড়ি এসে একটা নতুন জিনিষ দেখলাম কোলকাতার পথে ঘাটে। একদম নতুন জিনিষ। দার্জিলিং এর মত পথে ঘাটে সুন্দর সুন্দর কুকুর। বিভিন্ন ধরনের উন্নত প্রজাতির কুকুর। ল্যাব্রডর, ডোভারম্যান, অ্যালসেসিয়ান, বক্সার আর ডালমেশিয়ানই বেশী। আমার কোন দিন কুকুর পোষার সুযোগ হয়নি। হোস্টেলে হোস্টেলে জীবন কাটছে। ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে আমি মাকে বললাম, মা, একটা কুকুর পুষবো। দ্যাখ কী ভালো ভালো কুকুর রাস্তায় ঘুরছে। আমি ঐ ডালমেশিয়ানটা বাড়ি নিয়ে যাব।

মা আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, ওসব রাস্তার কুকুর, পুষতে নেই।

আমি তখনও বাচ্চা খুব। অবাক হওয়াটা তখনও আছে। বললাম, না গো মা, এগুলো সব দামি কুকুর। বিদেশী কুকুর। মা হাত ধরে টানতে টানতে কুকুরগুলোর থেকে দূরে নিয়ে যেতে যেতে বলল, কুকুরগুলো খুব ডেঞ্জারাস। ওরা এখন সব রাস্তার নেড়ি কুকুর হয়ে গেছে। চল চল। এখান থেকে তাড়াতাড়ি সরে যাই।

আমি কুকুরগুলোকে ভালো করে দেখি। সত্যিই তো ওদের চোখের ইঙ্গিতে নীরব হিংসা আলোড়িত হচ্ছে হিংস্র সাপের বিষথলির মতো। অনুগত প্রজাতির কুকুরগুলোর চিকন গ্রীবায় আহত ক্ষোভ, ঘর থেকে বের করে দেওয়ার।

– ওমা, এই কুকুরগুলোকে রাস্তায় ছেড়ে দিল কারা ? এদের তো অনেক দাম !

– দাম আগে ছিল। বিদেশে সাপ্লাই যেতো। দেশেও লোকজন খুব কিনতো। কিন্তু অনেক লোক কুকুর পোষে ভালোবাসায় নয়। তাদের ঘরে বছরে দুবার করে বাচ্চা দিত কুকুরগুলো। এক একবার ছ-সাতটা। সেই বাচ্চাগুলোর আবার অত অত বাচ্চা। সাপ্লাই বেড়ে যাওয়ায় ডিমান্ড হঠাৎ নেমে আসে শূন্যতে। তখন কুকুরগুলো রাস্তায় ছেড়ে দিতে থাকে।

– ও মা, এতো তুমি কমার্সের কথা বলছে। কুকুরতো ভালোবাসার জিনিষ গো !

– ভালোবাসার জিনিষ নিয়ে ব্যবসা করতে গেলে এরকমই হয় রে রঙ্গিন। যারা মাদী কুকুরগুলোকে কারখানার যন্ত্রের মতো ব্যবহার করতো টাকার জন্যে, তারাই খাওয়াতে না পেরে রাস্তায় কুকুরগুলোকে অসহায় ভাবে ছেড়ে দিচ্ছে।

– যাহ: এখন কী হবে মা ? কুকুরগুলোর কী বাজে অবস্থা ভাবো। ওদের কী আর এ রকম রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো অভ্যাস আছে, বলো মা ?

 

}{ ৩ }{

গত পাঁচ-ছ বছরে কোলকাতার পরিস্থিতি একদম বদলে গেছে। ঘর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া বিদেশী কুকুরগুলো উৎকট উল্লাসে মেতেছে প্রবল অভিমানের জেরে। প্রথম প্রথম ডাস্টবিনে হামলা করতো খাদ্যের জন্য। জঘন্য খাদ্য তাদের খাদ্যনালীর অভ্যাস নেই। তবু বেঁচে থাকার থেকে বড় কী হ’তে পারে। ডাস্টবিনে খাদ্য শেষ হয়ে যায় দ্রুতই। তাছাড়া এই পাঁচ-ছ বছরে কুকুরগুলো বদলেছেও অনেক। বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে ক্রস ব্রিডিং হয়েছে। তার মধ্যে আমাদের নেড়িরাও অংশ নিয়েছে। ইন ব্রিডিং হয়েছে অকাতর। তার ফলে কুকুরগুলো একদম অন্যরকম একটা প্রজাতির মতো লাগছে। চোখগুলো চতুর শেয়ালের অথচ হায়েনার মতো তাদের হাবভাব। বিবর্তনের এই সামান্য সময়েই কুকুরগুলো যেন আর কুকুর নেই। কোলকাতার এ মাথা ওমাথা আগুন ফিরি করে বেড়ায় কুকুরগুলো।

ডাস্টবিনের খাদ্য কম হতে প্রথম আক্রমণ করে ডাস্টবিনে নোংরা কুড়ানো মানুষগুলোকে। দু-একটা প্লাস্টিক কুড়ানো মানুষ হাপিশ হয়ে যেতেও শহরের টনক নড়ে না। তারপর শহর থেকে একে একে অদৃশ্য হয়ে গেল পাগলগুলো। রাতদুপুরে কুকুরগুলো হামলে পড়ে আক্রমণ করে। কয়েক মিনিটেই মানুষটার উরুর ফিনা-বোন ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট রাখে না। আর জায়গাটায় উড়তে থাকে ভিজে চুল। কালো চুলে লাল রক্তের ছিটে। ফুটপাথে শুয়ে থাকা রিক্সাওলা, ফুচকাওলা, ঝাঁকা মুটে পরপর হারিয়ে যেতে লাগলো। দলদল মানুষ কুকুরগুলোর হাত থেকে পালাতে শিয়ালদা আর হাওড়া স্টেশন ধরে পালাতে লাগলো। বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থীরা ভিড় করে শিয়ালদা দিয়ে ঢুকেছিল। এবার বিপরীত চিত্র। যে যত পারছে স্টেশনের ভেতরে সেঁধিয়ে যাচ্ছে। তার মধ্যেই দু একজন হারিয়ে যাচ্ছে কুকুরগুলোর চোরাগোপ্তা আক্রমণে। উদ্বাস্তু-মানসিকতায় কেউ সেদিন ফিরেও তাকাচ্ছে না।  শহরে পুলিশ নেই, আইন নেই, কেউ নেই। যে যার প্রাণ বাঁচাতে শহর ছেড়ে পালাচ্ছে।

অথচ কুকুরগুলো কেউ কোলকাতা ছেড়ে যাচ্ছে না। এত খাদ্য পাবে না বলে হয়তো। তার থেকেও বড় একটা জিনিষ লক্ষ্য করা গেছে, কুকুরগুলো পেট্রোলের গন্ধ খুব পছন্দ করে। পেট্রোলের ধোঁয়ায় এক ধরনের নেশার আরাম পায়। এমনিতেই যখন তখন দল বাঁধা কুকুরের আক্রমণে মানুষ বের হতে সাহস পাচ্ছে না। দরজা বন্ধ বাসে ছাড়া মানুষ উঠতে সাহস পাচ্ছে না। পেট্রোল প্রাইভেট কার নিয়েও কেউ বেরতে সাহস পাচ্ছে না। জানলা ভেঙ্গে ড্রাইভারকে মেরে পেট্রোল ট্রাঙ্ক ফুটো করে পৈচাশিক নেশায় ডুবে যাচ্ছে কুকুরগুলো। বাইক নিয়ে রাস্তায় বের হওয়া আর হেঁটে সমুদ্র পার হওয়া এক ব্যাপার হয়ে গেছে। অবস্থা এমন যে যাদের বাড়িতে বাইক আছে তারা বাইক রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসছে। যাতে বাইকের পেট্রোলের জন্য কুকুরগুলো বাড়ি আক্রমণ না করে বসে।

এসব আর রাতকাহিনীর গুজব নয়। চোখের সামনে দেখা ঘটনা এবং নিত্যই ঘটমান। ফলে দীর্ঘ হতে থাকে আতঙ্ক। এখন এমন অবস্থা ঘর থেকে কেউ বের হতেই সাহস পাচ্ছে না। যারা পালাতে পেরেছে তারা বেঁচে গেছে। যাদের যাবার জায়গা নেই তারা ঘরে বসে যোগাযোগ করছে। যদি কোন ভাবে সাহায্য মেলে। টিভিতে খবর দেখছে, মোবাইলে সাহায্য চাইছে। কিন্তু আপ্তবাক্য ছাড়া কোন সাহায্যই পৌঁছচ্ছে না। সব থেকে বড় কথা গত দশ দিনে শহরটা কার্ফু শহরের মত হয়ে গেছে। ধুলোমাটির আমজনতা একজনও নেই শহরে। ঘর বন্দী মানুষগুলো যেন মাঝ দরিয়ায় আটকে আছে। খাদ্য শেষ। বের হতে পারছে না। কিনে এনে দেবারও কেউ নেই।

}{ ৪ }{

আমি এখন বাড়িতে। উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্টের অপেক্ষায় হোস্টেল থেকে দেশের বাড়ি ঘুরে কোলকাতায় এসে কুকুরকার্ফুতে আটকে গেছি ঘরে। বাবা-মা ডিজেল গাড়ি ভাড়া করে মাঝে মধ্যে অফিসে যাচ্ছিল। ফেরার সময় খাদ্যও আনছিল। গত দশ দিন আর বের হবার সাহস দেখায়নি। কোলকাতার মানচিত্র জুড়ে অসংখ্য হাড় পাঁজর পড়ে আছে। কী উত্তরের সাবেকী পাড়া, কী দক্ষিণের নতুন গজানো কোলকাতা ! রাস্তায় মানুষের হাড় মাড়িয়ে চলছে সামান্য গাড়িঘোড়া। মানুষের শক্ত হাড়ে গাড়ির টায়ার পাংচার হয়ে যাচ্ছে।। বাইরে বেরিয়ে লিক সারাবার উপায় নেই। যে কোন মুহূর্তে একপাল কুকুর আক্রমণ করে কয়েক মিনিটে মানুষটাকে কয়েক খণ্ড হাড়ে পরিণত করে দেবে।

গত তিনদিন আমরা আধপেটা খেয়ে আছি। আজ বাড়িতে জল ছাড়া কিছু নেই। আমার আঠেরো বছরের উঠতি শরীর। গত এক বছর হোস্টেলে জিম করি নিয়মিত। খাদ্য আমার প্রাণের সব থেকে জরুরী প্রয়োজন। কিন্তু খাবার পাই কোথায় ? কিনতে বেরোলে রাস্তায় আমিই কুকুরগুলোর খাদ্য হয়ে যাব। আর কয়েক ঘণ্টা না খেয়ে থাকলে আমিও হয়তো কুকুরগুলোর মত হিংস্র হয়ে উঠবো। সামনেই একটা মল আছে। ওখানে পৌছাতে পারলে খাবার পাওয়া যাবে।

মনে মনে একটা বুদ্ধি খেলি। আমাদের ফ্ল্যাট বাড়ির চিলে কোঠায় লম্বা শক্ত একটা দড়ি আছে। ওটা দিয়ে এবাড়ি থেকে ওবাড়ি ঝুলে ঝুলে যাব। অনেকটা রোপওয়ের মতো।

– মা টাকা দাও !

– টাকা কী হবে রে রঙ্গিন ?

– খাবার কিনতে বের হবো।

– খাবার কোথায় কিনতে যাবি ? রাস্তার অবস্থা জানিস ! আজ দিনটা যা হোক করে কাটা। টিভিতে বলছে কাল থাকে হেলিক্যাপ্টারে করে খাবার ফেলবে সরকার থেকে। আরও একটা ভালো খবর আছে। সাঁজোয়া গাড়ি আজ রাত থেকেই বের হবে কুকুরমারতে। বন্ধুক দিয়ে গুলি করে ঝাঁকে ঝাঁকে মেরে দেবে শয়তান কুকুরগুলোকে। সুপ্রিম কোর্ট পশুপ্রেমীদের আবেদন নাকচ করে সেনা বাহিনীকে কুকুরহত্যার অনুমতি দিয়েছে। আর এক দুদিনের মামলা রঙ্গিন। এখন একটু ধৈর্য্য ধর।

– না আমার এখনই খাবার চাই। সরকারের উপর ভরসা তোমরা করো। আমি সামনের মল থেকে খাবার আনতে যাব। টাকা দাও !

– কী করে যাবি ?

– দড়ির রোপওয়ে। চিলে কোঠায় একটা লম্বা শক্ত দড়ি আছে আমি দেখেছি।

মা জানে আমাকে কিছু বোঝাতে যাওয়া আর ভাঙ্গা বাঁধে অক্লান্ত জল সেচে যাওয়া একই ব্যাপার। তাছাড়া ছেলের প্রতি তার ভরসাও আছে। স্কুল জীবনেই অসম্ভব সব কাণ্ড ঘটিয়েছি আমি। আমার একটা গুণের কথা মা খুব ভালো জানে।  নামভার। আমি যাকে যে নামে ডাকি সে তেমনই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের হয়ে যায়। ক্লাস টেনে একবার অনেকগুলো ডেঁয়ো পিঁপড়ে রান্না ঘরে মাকে খুব জ্বালাচ্ছিল। আমি মার অস্বস্তি দেখে পিঁপড়েগুলোকে মৌমাছি ভেবে ফেলতেই পিঁপড়েগুলো ডানা গজিয়ে মৌমাছি হয়ে পাখা মেলে ফুলের বাগানে উড়ে যায়।

}{ ৫ }{

ঝুলতে ঝুলতে শপিং মলটায় ঠিক পৌঁছে গেলাম। সেখানে একজন মাত্র সিকিউরিটির লোক ভেতর থেকে তালা বন্ধ করে বসে আছে। দামি মলটা খাঁ খাঁ করছে। আমি পিঠ ব্যাগ ভরে খাবার নিলাম। দাম দিতে চাইলে সে এই অবস্থা থেকে মুক্তির দিশা জানতে চায়। আমি মায়ের থেকে যতটা শুনেছিলাম বলে তাকে আস্বস্থ করলাম। কিন্তু তার প্রতিটা শোকের উচ্চারণে আমার আশ্বাস কোন কাজ দিল না।

আমি যে ভাবে ঝুলে ঝুলে এসে ছিলাম সেভাবে ফিরতে লাগলাম। সামান্যই পথ, এক দৌড়ে বাড়ি পৌঁছে যাওয়া যাবে। কিন্তু নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম দল দল কুকুর দুপুরের ছায়া মাড়িয়ে এগিয়ে আসছে শপিংমলটার দিকে। ওদেরও বোধহয় গত কদিন খাওয়া হয়নি। নির্ভুল দংশনে আমাকে ছিঁড়ে খেতে উদ্যত। ওদের বাঘনখে লেগে আছে আমার মতো বহু মানুষের টাটকা রক্ত। কিন্তু আমার খাদ্য হওয়ার কোন বাসনা নেই।

ঝুলতে ঝুলতে আমি এগিয়ে যাচ্ছি বাড়ির দিকে আর কুকুরগুলো ছুটছে রাস্তা আর তার শত্রু ডিভাইডার মাড়িয়ে। অন্তত দু-তিন শো কুকুর ঘাড় তুলে মাপছে খাদ্যের পরিমাণ আর গুনমান। আমার জিম করা পেশিবহুল শরীর তাদের খাদ্য হিসাবে লোভনীয়ই হবে বোধ হয়। কিন্তু আমার হাত যে ছাড়ার নয়। দড়িতে গিটের মতো শক্ত করে ধরে রেখেছে আমাকে। কিন্তু হঠাৎ করে দড়িটাই ছিঁড়ে যায় বা খুলে যায় দূরের প্রান্ত। আমি সিনেমায় দেখা স্পাইডারম্যানের মতো পেন্ডুলাম দোল খেয়ে শপিং মলের সামনে এসে পড়ি। ঠিক পড়ি না দাঁড়িয়ে যাই।

আমাকে পড়ে যেতে দেখে কুকুরগুলো আমার দিকে পাশবিক চিৎকার করতে করতে ভেলভেট ঢেউএর মত এগিয়ে আসতে থাকে। আমার আর কিচ্ছু করার নেই। মৃত্যুর কয়েক সেকেন্ড দূরে দাঁড়িয়ে মায়ের কথা মনে পড়ে খুব।  মায়ের কথা মনে পড়তেই মনে পড়ে আমার দৈবগুনের কথা। নামভার। মা কে একবার পিঁপড়ের হাত থেকে বাঁচিয়ে ছিলাম, পিঁপড়েগুলো কে মৌমাছি ক’রে বাগানে উড়িয়ে দিয়ে। ভয়ংকর কুকুর গুলোর দিকে আমি ভালো করে লক্ষ্য করি। এদের তো নরমগোঁফ আছে। আমার কী যেন হয়ে গেল। কুকুরগুলোকে বিড়াল ভেবে উল্টো দিকে মুখ করে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকি নিশ্চিন্তে। আর কুকুরগুলো বিড়ালের মতো মিউ মিউ করে থমকে যায় আমার পিছনে।

আমার নামভার কোলকাতাকে আরও ভয়ঙ্কর বিপদ থেকে বাঁচিয়ে দেয়। হয়তো বা অসহায় কুকুরগুলোকেও। এবং সেই মুহুর্তে আমাকেও।