গল্প, হুমায়ুন

গল্প, হুমায়ুন

প্রিয় গল্পকারকে নিয়ে যখন লেখক লেখে জীবনের সেরা গল্প সেই গল্পের রূপ এমনই হয়…

গল্পকার,- ডি. অমিতাভ


-: প্ল্যান-এ :-
অনেকটা টেনে বেঁধেছে। মনে হয় আরও একটু তুলে নিতে পারলে ভালো হতো তার মৌচাক। বয়েসতো একটু হয়েইছে। মৌচাক বড় হয়েছে, তাই কিছুটা ঝুলেওছে। রানী মৌমাছি এখন ডাঁস মাছির মতো বড়। সে দুটোও প্রকট করতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু শীতকাল। ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ। এবছর সব কিছু দেরী করে এসেছে। দূর্গাপূজা কার্ত্তিক মাসের ক্যালেন্ডারে উপচে পড়েছে। বর্ষা দেরীতে এসেছে। কিন্তু শীত এসেছে সময় মেনে। এবং তীব্রতাও দেখার মতো। উষ্মায়ণকে তাচ্ছিল্য করে গত দুদিন শীত পড়েছে হাড় হিম করা। সূর্যের দেখা পাওয়া যায়নি এক পলকও। অপেক্ষা শাড়ির ওপর একটা হালকা বেগুনী লং কাশ্মিরি কোট চাপায়। উঁচু পাছা ছাপিয়ে অনেকটা নেমে এসেছে। লাইফ সাইজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখে যৌনতা ঢেকে গিয়েছে ঠিকই তবে আকর্ষণ বেড়েছে কয়েক গুণ।
অপেক্ষা আজকের দিনটার জন্য অনেক স্কিম করে রেখেছে। না তারিখে তার কোন গুরুত্ব নেই। যদি ঠিকঠাক হিসাবকষে পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে তবে আজ এই আঠেরোই ডিসেম্বর দিনটা তার ক্যালেন্ডারে রঙ্গিন হয়ে থাকবে। গত ছমাস ফেসবুকে সে বিখ্যাত লেখক পরিমল গোঁসাই এর পিছনে পড়ে আছে। নামটা শুনতে পুরানো পুরানো হলেও পরিমল বলতে গেলে উঠতি বয়েসের ছোঁড়া। লেখকদের আটত্রিশ একটা বয়েস হলো নাকি ! আটান্নয় লোকে লেখক পরিচিতি পায়। আর সেখানে পরিমল আটত্রিশেই নামজাদা লোক। টিভির টকশো, খবরের কাগজে বক্তব্য তো আছেই। এবছর নতুন সরকার নাকি তাকে সিলেবাসেও ঢুকিয়ে নিতে চেয়েছিল। কোন একটা কারণে হয়নি ঠিকই তবে যেকোন দিন হয়েও যেতে পারে। ক্লাস টুয়েল্ভ না হোক ক্লাস টুতে ঢুকে যাবে পরিমল। এমনটাই শুনেছে অপেক্ষা।
পরিমল গোঁসাইএর ফেসবুক পোষ্ঠ লাইক তো সবাই মারে। কিন্তু অপেক্ষার কমেন্টস থাকতো মারকাটারী। গঙ্গা জলে গঙ্গাপূজা। পরিমলের গল্প থেকেই উদ্বৃতি দিয়ে বাজিমাত। তার জন্যে অপেক্ষাকে খাটতে হয়েছে অনেক। খুঁজে খুঁজে তার সব গল্প পড়তে হয়েছে। বছর পাঁচেক গল্প লিখলেও এখনও তার বই নেই যে সব ভালো গল্প দুই মলাটের মধ্যে পাবে। অপেক্ষা এ পত্রিকা সে পত্রিকা ঘেঁটে সংগ্রহ করেছে তার গোটা চল্লিশ গল্প। পড়েও ফেলেছে সব কটা গল্প। তবে হ্যাঁ অপেক্ষার ভালো লাগে পরিমলের গল্প। এখানটায় ফাঁকি নেই । অপেক্ষার নিখাদ ভালোলাগা জড়িয়ে আছে পরিমলের কলমে।
অপেক্ষা রূপটান শেষ করতে করতে স্কিমটা আর একবার মনের মধ্যে মেখে নেয়। মুখোশেও লেগে যায় বেশ কিছুটা মনের সৌরভ। তার লেখা-জোকা বেশ কয়েকটা পড়ে শোনাবে পরিমল গোঁসাইকে। সুন্দর করেই শোনাবে। সে ভালো লেখে সবাই বলে। সেও বিশ্বাস করে অন্য লেখকদের মতোই, সেও ভালো লেখে। কিন্তু ঠিকঠাক জায়গায় ছাপা হচ্ছে না বলে তার আত্মবিশ্বাস টাল খেয়ে যায় বারবার। সে একটা এন.জি.ও তে চাকরি করে। চাকরি না হাতি ! পথশিশুদের গানইস্কুলের দিদিমনি। এই স্ট্যাটাসে লেখা ছাপা হয় না অথবা তার লেখা বড় পত্রিকার মান ছুঁতে পারছে না; সেটাই সে বুঝতে পারছে না। আজ যদি তার লেখাপত্র পরিমল গোঁসাইএর পছন্দ হয়; সে অনুরোধ করবে কোথাও ছাপিয়ে দেওয়ার। ভালো লেখা সবাই খোঁজে। ভালো বললে এটুকু বলার মতো সেজেছে সে। সুন্দরীদের রূপের থেকেও সাজের ওপর বিশ্বাস প্রগাঢ়।
-: প্ল্যান-বি :-
সকাল থেকেই পরিমলের মুড খারাপ। হঠাৎ করে ঠান্ডা লেগে ডান দিকের উপরের মাড়ি ব্যাথা। কাল নলেনগুড় দিয়ে রুটি খেয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই মিষ্টি খেতে ভালোবাসে সে। বহুদিন খাঁটি নলেনগুড় খায়নি। দুপুরে আর রাতে নলেনগুড়ে রুটি চুবিয়ে চুবিয়ে খেয়েছিল। বেশ কিছুটা চুমুক মেরেওছিল দুপুরে। দুপুরে বাড়িতে কেউ থাকে না। বিধবা মা গিয়েছে বোনের বাড়ি। ছেলের স্কুল ফুলদমে চলছে। ইংলিস মিডিয়াম। আর বউএর স্কুলে কাজ না থাকলেও সাড়ে চারটে পর্যন্ত হেডমিসট্রেস বসিয়েই রাখে। খাতা দেখা, রেজাল্ট তৈরী শেষ তবুও বসিয়েই রাখে। নতুন হেডমিসট্রেস মনে করে স্কুলটা তার রাজত্ব আর দিদিমণিরা তার দেওয়ান, মনসবদার বা উজির। একদিকে ভালোই হয়েছে। দুপুরটা ফাঁকাই পাওয়া যায়। ফাঁকা বাড়িতে লেখালেখিতে ঝাঁপমারা যায় চোখ বুজিয়ে। কাল ফাঁকা বাড়িতে পরিমলের বয়েস কমে গিয়েছিল আচারচুরির বয়সে। ফলে আজ ঠান্ডায় দাঁতে ব্যাথা।
কাল রাতে অপেক্ষা ঘোষ বলে ফেসবুকের মেয়েটা বাড়িতে আসবে বলায় না বলতে পারেনি পরিমল। এমনিতে অনেকেই আসে। লেখালেখি জগতের অনেক লোকই তার বাড়িতে আসে। যখন থেকে সে লেখালেখিকে নিজের একমাত্র পেশা হিসাবে নিয়েছে তখন থেকেই সারা দুপুরটা সে একা কাটায় বাড়িতে। তার লেখাগুলোর ভাবনার জমাট বাঁধে সাধারণত সন্ধ্যা থেকে। শাঁখের আওয়াজ শুনলে তবেই মাথাটা পরিস্কার হয়, এমনটাই তার বিশ্বাস। বাড়িতে থাকলে মা এই বয়েসেও বেশ লম্বা শঙ্খধ্বণি দেয়। আসলে অভ্যাসের ব্যাপার। মা না থাকলে এখন মৌমিতা শাঁখ বাজায়। মৌমিতার নাকি শাঁখ বাজাতে লজ্জ্বা লাগে। আধুনিক মেয়েদের মতই ঘোমটা দেওয়া, আলতা পরা বা কাউকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে মৌমিতার লজ্জ্বা লাগে। বলে অবসোলেটেড। ইংলিশে এম.এ, কনভেন্ট শিক্ষিকা মৌমিতা সুন্দরী না হলেও যথেষ্ঠ স্মার্ট। তার ওপর আবার বছর দুয়েক হাইস্কুলে মাস্টারী পেয়েছে। আর কি বলা যায় কিছু ! তবে পরিমল জানে বউ এর চাকরীটাই তাকে পেশাদার লেখক হবার সাহস জুগিয়েছে।
অপেক্ষা মেয়েটা যথেষ্ট সুন্দরী। অন্তত ফেসবুক প্রফাইল পিকচারে তো সুন্দরীই লাগে। তবে ফেসবুক ছবির উপর বিশ্বাস না করাই ভালো, জানে পরিমল। কাল বাড়িতে আসতে বলার পর মেয়েটার প্রোফাইল খুঁটিয়ে দেখেছে। খুঁটিয়ে বলতে পিকচার ছাড়া দেখার কীই বা আছে। পিকচারগুলো দেখে মনে মনে নিশ্চিন্ত হয়েছে, এ মেয়েটা অন্তত: সুন্দরী। বয়েসও অল্প। ছাব্বিশ সাতাশ হবে। ফেসবুকে ফ্রেন্ড ফলোয়ার
পাঁচ-ছ হাজার। একটা বড় এন.জি.ও তে স্ট্রিটচিলড্রেনদের গান শেখায়। অপেক্ষাকে বেশ মজাদার চরিত্র লেগেছে পরিমল। তার গল্পের মারাত্বক ভক্ত বা কখনও কখনও মৃদু সমালোচকও। একটা গল্পে পরিমল মেয়েদের সামান্য খোঁটা দিয়ে রূপকে একটা তীর্যক মন্তব্য রেখেছিল; সেটা নিয়ে অপেক্ষা ইনবক্সে তাকে কতো অনুযোগ করল ! গত মাস তিনেক পরিমলের সব ফেসবুক পোষ্ঠে অপেক্ষার কমেন্টস থাকবেই থাকবে। আর কমেন্টসগুলো পড়লে বোঝা যায় মেয়েটির ওপর তার যথেষ্ঠ প্রভাব। অথচ মেয়েটি যা সুন্দরী ইচ্ছা করলে মডেল বা অভিনেত্রী হতে পারে ভাবে পরিমল। পরক্ষণেই ভাবে, যাগগে আমার অত ভেবে লাভ কী ! আমার নিজের কাজটা করা নিয়েই ভাবি গে ! সামনে সপ্তায় পরিমলের প্রথম গল্পের বই বেরবে “সবুজগল্প”। বইটার বেশিরভাগ গল্পই বিভিন্ন বড় দৈনিক সংবাদপত্র বা বিভিন্ন বাণিজ্যিক পত্রিকায় বেরিয়ে গিয়েছে। মাঝারি একটা প্রকাশক “সবুজগল্প” বইটা বের করছে। প্রথমে দু’শ কপির প্রথম সংস্করন হবে। কলকাতা বইমেলার আগে দু’শ কপি বিক্রি হয়ে গেলে, বইমেলার সময় দ্বিতীয় সংস্করন করা হবে। এবং প্রথম বই হিসাবে সেটা বেশ গর্বের হবে। অপেক্ষা বলে মেয়েটা পরিমলকে বলেছে যে বেশ কিছু “সবুজগল্প” বিক্রি করে দেবে। তার যথেষ্ট বন্ধু ও যোগাযোগ। পরিমলের স্কিম একটাই। যেকোন ভাবে মেয়েটাকে রাজি করাতে হবে। ঘর বয়ে লক্ষ্মী আসছে। অবশ্য প্রস্তাবটা মেয়েটা নিজেই দিয়েছে। তাছাড়া অনেকটা সময় একা কাটানো যাবে একটা কম বয়েসী সুন্দরীর সঙ্গে, এটা সব পুরুষের কাছেই আনন্দের। পরিমল ভাবে, আনন্দের দূত তুমি অপেক্ষা।
-: প্ল্যান-সি :-
মৌমিতা কদিন বেশ ফেসবুক করছে। এমন কী স্কুলেও টিফিনে ফেসবুক খুলে দেখছে। এমনিতে ফেসবুক সবার কাছে নেশা। কিন্তু মৌমিতা নিজের জন্য ফেসবুক খুলছেনা। নিজের একাউন্ট খুলেই চলে যাচ্ছে পরিমলের ওয়ালে। সেখানে ক্লাস রুমের সব থেকে নটি স্টুডেন্ট খোঁজার মত খুঁজছে অপেক্ষা ঘোষের কমেন্টস্। দিন পনেরো আগে থেকে সে এটা করছে। খুঁজছে, পড়ছে কিন্তু কিছু বলছে না পরিমলকে বা লিখছে না অপেক্ষাকে। মৌমিতা অপেক্ষা করছে ক্লাসের নটি স্টুডেন্ট কখন দুষ্টুমি করে। কিন্তু ফেসবুকের অপেক্ষা তার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে। ওয়ালে তো কিছু খারাপ দেখতে পাচ্ছে না কিন্তু ইনবক্সে কী হচ্ছে কে জানে ! তবে মেয়েদের তো একটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আছে, সেটা বলছে কিছু একটা ষড়যন্ত্র চলছে তার পিছনে।
কাল রাত্রে যখন পরিমল বলল, মৌমা, কাল দুপুরে একজন বাড়িতে আসবে; তখনই মৌমিতা বলল, কে ?

  • একজন আমার “সবুজগল্প” প্রমোট করবে বলেছে।
  • হঠাৎ তোমার বই কেন ?
  • আমার পাঠক তাই।
  • কী নাম ?
    জিজ্ঞাসা করতে গিয়েও করে না। মৌমিতা নিজেই চমকে যায়। দশ বছরের বিয়েতে এই প্রথম সে পরিমলকে সরাসরি সন্দেহ করলো। এমনিতে লেখকদের অনেক বদনাম থাকে নারী প্রসঙ্গে কিন্তু পরিমল গোঁসাই তেমন আধুনিক নয় নিজের নামের মতোই।
    তবু আজ মৌমিতার কেমন একটা মন টানছে। স্কুলে কাজ তেমন নেই। টিচার্সরুমে বারোটা নাগাদ ফেসবুক খোলে। খুলেই অবাক। অপেক্ষা ঘোষ স্ট্যাটাস দিয়েছে, ইউপ্ গোয়িং টু মিট মাই ফেবারিট অথোর অফ দিস টাইম। সঙ্গে তিনটে তিনরকম স্মাইলি। মৌমিতা স্ট্যাটাসটা পড়ে ভাবে কাল রাতের কথোপকথনটা পরিমলের সঙ্গে শেষ করলেই হতো ! পাঠকের নামটা জেনে নিলেই হতো ! আজকাল আবার কেউ লেখিকা নয়, সবাই লেখক। তেমনি হয়তো সবাই পাঠক। সে কি এখন একবার পরিমলকে ফোন করে জানবে তার পাঠকের নাম কী ? না অপেক্ষাকে ফেসবুকে জানতে চাইবে কোন লেখক ? অপেক্ষা ঘোষ তারও ফ্রেন্ডলিষ্টে আছে। জানতেই পারে। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবে ফেসবুকে অনেকেই জানে সে পরিমল গোঁসাই এর স্ত্রী।
    মৌমিতা কোন উপায় না পেয়ে স্ট্যাটাসের নীচে কমেন্টস্ এ ক্লিক করে। ওপর থেকে নীচে স্ক্রল করেও বুঝতে পারে না কে তার ফেবারিট অথোর অফ দিস টাইম ! খুব বিরক্ত লাগে নিজের উপর তার। সে কোন সন্দেহ করতে চাইছে না কিন্তু পারিপার্শ্বিকতা তাকে বর বার চোরকাঁটার দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। শেষ কিছু ভেবে না পেয়ে অপেক্ষার প্রোফাইলে ক্লিক করে। মেয়েটি আমুদে সুন্দরী। আজকালকার মেয়েরা যেমন হয় আর কী। হেন পোজ নেই যে পোজে তার পিকচার নেই। নারকেলগাছের গোড়ায় দাঁড়িয়ে যেমন আছে, নারকেলগাছের উপর থেকে তুলে দেওয়া ফটোও আছে। বয়েস কম মেয়েদের যেমন হয়। কিন্তু এ মেয়ের প্রোফাইলে কোথাও বোঝা যাচ্ছে না যে তার সাহিত্যপ্রীতি আছে। বরং সিনেমার যে পোকা বোঝা যাবে তার গ্রুপ আর পেজগুলো খুঁটিয়ে দেখলে। তবে পরিমল গোঁসাই বলে যে পেজ আছে তার মেম্বার।
    মৌমিতা আর কিছু ভাবে না। সে সিদ্ধান্ত নিয়েই নেয় বাড়ি যাবে। ঠিক সন্দেহ নয়। হঠাৎ করে সব স্মার্টনেস ছেড়ে সাবধানী হয়ে ওঠে। এই বয়েসটা ছেলেদের ভালো নয়। চল্লিশ ছুঁই ছুঁই বয়েসে ছেলেদের চালসে ধরে। যদি সন্দেহজনক কিছু হয় ? আর যদি না হয়, আগন্তুককে দ্রুত বিদেয় করে নিশ্চিন্তমনে পরিমলকে আদর করা যাবে। বড় আদর। ছেলেটা বড় হচ্ছে বলে আজকাল আর হয়ই না। স্কুল থেকে বাবাইএর ফিরতে চারটে বেজে যাবে। এখন এইচ.এম. এর কাছে ছুটি নিলে একটার মধ্যে বাড়ি। তারপর তিন ঘন্টা ফাঁকা বাড়িতে নিশ্চিন্তে দাপাদাপি করা যাবে। মৌমিতা টিচার্সরুম থেকে ব্যাগগুছিয়ে এইচ.এমএর রুমের দিকে বেরিয়ে পড়ে। আজ নতুন বড়দিন মুড ভালো দেখেছে সকাল থেকে।
    -: প্ল্যান ঘেঁটে “ঘ” :-
    কোলকাতার দু প্রান্তে দুজনের বাড়ি। না দু প্রান্তেরও বাইরে। দুজনেই পঞ্চায়েত এলাকায় থাকে। তবু দুজনেই দুজনকে নাগরিক ভাবে। সেভাবেই কথা শুরু হয় পরিমল আর অপেক্ষার। আসলে দুজনেই গ্রামীন সরল বোঝা যায় একটু পরেই । কেউ কারও স্কিমই টেবিলে ফেলতে পারে না।
  • আসুন আসুন আপনার জন্যই অপেক্ষা করছি।
  • আমি অপেক্ষা ! আমার জন্যে সবাই অপেক্ষাই করে !


কথাটা অহংকারের সুরে বলেও অপেক্ষা ঘরে ঢুকেই যে কাজটা চেয়ারে বসার আগে করলো, সেটা পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম। পরিমল আজকাল কাউকে বড় একটা পায়ে হাত দিতে দেখেনি। তার তেমন বয়েসও হয়নি হয়তো। তবু প্রত্যেক প্রণাম মানুষকে অন্য রকম সততায় পৌঁছে দেয়; যে করে এবং যাকে করা হয়। পরিমল এবার সরাসরি আপনি থেকে তুমিতে চলে যায়। সৌন্দর্যের আনন্দের থেকে তাকে স্নেহের
সুখ পেয়ে বসে।

  • তুমি অনেকটা দূর থেকে এসেছ। তা বলো তুমি হঠাৎ আমার কাছে এলে কেন ?
  • আমি আপনার গল্পের বড় ফ্যান। প্রতিটা গল্প আমাকে মুগ্ধ করে। প্রতি গল্পের নতুনত্ব আমায় ভাবায়। আপনার প্লটগুলো অসাধারণ।
    অপেক্ষা ভুলে যায় তার সমস্ত স্কিম। নিজের গল্প পড়া, ছাপানোর অনুরোধও। পরিমলও কথার তোড়ে ভুলে বসে তার “সবুজগল্পের” প্রমোশনাল কথাবার্ত্তা। দুজনে মেতে যায় সাহিত্যের তুমুল আলোচনায়।
  • আমার গল্পে কী আর প্লট ! প্লটের রাজা তো হুমায়ুন আহমেদ। পড়েছো হুমায়ুন ?
  • হ্যাঁ আমিও ওনার খুব ভক্ত।কিন্তু ওনার বই তো কোলকাতায় বেশি পাই না। তবু মিশির আলি আমার প্রিয় চরিত্র। কী দারুন সব লেখা।
  • জানো তো, উনি নিজে সাইন্টিস্ট ছিলেন ?
  • কই না তো ! তাই নাকি ?
  • হ্যাঁ নিজে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন।
  • তাই ?
  • হ্যাঁ আর জানো উনি বাংলাদেশে কত জনপ্রিয় !
  • কেমন জনপ্রিয় ?
  • এক একটা “একুশে বইমেলায়” ওনার বই বিক্রি হয় ভাবলে অবাক হয়ে যাবে। আন্দাজ করো একটা নতুন বই এর কত কপি বিক্রি হতে পারে ?
  • পঞ্চাশ হাজার ?
  • দশ লক্ষ ! ভাবতে পারো ! শুধু লিখে ঢাকায় ওনার মস্ত প্রাসাদ আছে, বালি দ্বীপে নিজস্ব দ্বীপ ! ভাবো !
  • তাই নাকি ?
  • হ্যাঁ। আর জানোতো ওনার জোৎস্না নিয়ে পাগলামো প্যাশান ছিল ?
    হুমায়ুনে মজে আছে সাহিত্যের দুই ছাত্র তুমুল শ্রদ্ধায় আর ভক্তিতে। স্কুল থেকে ফিরে মৌমিতা বেল না বাজিয়ে সোজা খোলা দরজা দিয়ে স্বামীর লেখার ঘরে ঢোকে। আর নিজেও ঢুকে পড়ে হুমায়ুনের খোলা হাওয়ায়। লেখকের লেখার ঘর জেগে ওঠে তিন জনের শুভ্র্র আলোচনায়। সেখানে সব অস্তিত্ব মুছে যায় নিজের নিজের। ভুলে যায় সময়ও। বাবাই আজ প্রথম স্কুলবাস থেকে একাই ফিরছে বাড়িতে। তারপরও আলোচনা উৎসবের মেজাজে চলতেই থাকে। লেখকের ঘরের জানলা দিয়ে দেখা যায় শীতের বিকাল ফুরিয়ে দূর মাঠে সন্ধ্যা ঘন হচ্ছে।