রুদ্র গোস্বামী; কবি বন্ধু



রুদ্র গোস্বামী : কবি বন্ধু 

ডি. অমিতাভ

একবছর আগে,  তখন আমার উপন্যাস জলপঙখিরাজ সদ্য  প্রকাশিত বা প্রকাশিত হবে। অভিযান পাবলিশার্সএর কলেজ  স্ট্রিট অফিসে আড্ডা  হচ্ছে প্রকাশক মারুফ হোসেনের সঙ্গে। আমি তেমন পড়ুয়া নয়। শুনছিই বেশি। তবে যখন যেটা বলি সেটার ওপর বেশ জোর নিয়ে বলি! আকাট লোকেরা যেমন করে আর কী!

– কবিতার বই একদম বিক্রি নেই!

– কে বলেছে আপনাকে! আপনি জানেন কবিতার বই কত বিক্রি হয়?

– না বিক্রি হয় না। হলে, কবিদের দেখলে প্রকাশকরা এমন করে পালাতো না!

রুদ্র গোস্বামীর নাম শুনেছেন! তার বই কেনার জন্য লোকে বাংলাদেশে লাইন দেয়।

– সে বাংলাদেশে হতে পারে, ওদের বাংলা ভাষা নিয়ে অন্য রকম ভাবনা, ভালোবাসা ।

– আরে রুদ্র কোলকাতার ছেলে। অভিযান পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে বই। আর সে কবিতার বই বেস্টসেলার।

সেই প্রথম শোনা রুদ্র গোস্বামীর নাম।  বাংলা কবিতার পাঠক আমায় মাফ করবেন। আমি পড়িনি তাকে। আমি বঞ্চিত ছিলাম কবিতার অপার সুখ থেকে।

কবিতা এত সহজ অথচ হৃদয় ছোঁয়া হয় আগে জানতাম না। ভালোবাসা এমন স্নিগ্ধ সর্বগ্রাসী হয়  সেই প্রথম শিখলাম  ।  কবিতা এমন ভাবে বুকের  বামদিকে রক্ত চলকে দেয় অনুভব করলাম।

সাধারণ কথা এভাবে ভালোবাসার রঙে রাঙানো যায় আগে ভাবি নি। “কেউ একজন তো চাই যে বলবে টিপ বাঁকা”!  কত প্রেমিকার মনের কথা। কত পুরুষ সারাজীবনে কতবার টিপ ঠিক করে দিয়েছে।  সেই সাধারণ ঘটনাই কবির কলমে হয়ে ওঠে অসাধারণ কবিতা!!

“কেউ একটা তো চাই, টিপ সরে গেলে
আয়নার মতো বলবে ‘টিপ বাঁকা পরেছ।’
চোখের কাজল লেপটে গেলে ধরিয়ে দেবে।

কেউ একটা তো চাই, পিছু ডাকবে
বলবে ‘সাবধানে যেয়ো।’

কেউ একটা তো চাই, ঘড়ির কাঁটার মতো
কাছে থাকবে। অভিমান দেখলেই বলবে,
‘সবুজ পাতা তোমাকে ভালোবাসি।’

কেউ একটা তো চাই, ভুল গুলোকে
শুধুই বকবে না। কাছে টেনে বলবে ‘বোকা মেয়েটা,
আর কিছু ভালো রাখা যত্ন নিয়ো।’

কেউ একটা তো চাই, খোলা জানালার মতো
আমাকে আকাশ দেখাবে। বলবে ‘এখানে ঠিকানা রেখে
তুমি পাখি হয়ে যাও।’

কেউ একটা তো চাই, হাওয়ার শিসের মতো
কানে এসে বলবে ‘আমাকে ছাড়া কারো
প্রেমে পড়তে নেই।’

কেউ একটা তো চাই, শাসন করবে আমার
খুচরো বিষাদ, আর আমাকে লুঠতে আসা
ডাকাত স্মৃতি।

কেউ একটা তো চাইই, গ্রীষ্মে বিছিয়ে রাখবে বুকে
শীতলপাটি, বলবে ‘এই বুকের মধ্যে তোমাকে
বসতে দিলাম।’

কেউ একটা তো চাইই, কাছে থাকবে
‘তুমি’ বললেই যেমন দুঠোঁটে দুঠোঁট মেশে।

কেউ তো একটা চাইই, কিছুটা সে তাঁর মতো থাক,
কিছুটা আমার মতো হবে।”

কবিতার নাম কেউ একটা তো চাই।

এই কবিতাটাই আমার রুদ্রের পড়া প্রথম কবিতা। তারপর আমি বৃষ্টির জলে ছাতাবিহীন ভিজেছি তার একের পর এক কবিতায়।

অনেকেই বলে,  রুদ্র নাকি প্রেমের কবিতা ছাড়া লিখতে পারে না। আসলে রুদ্র লিখতে চায় না ভালোবাসার কথা ছাড়া। তাই নিজেই স্বগর্বে ঘোষণা করে “ভালোবাসা কোনো প্রসাধন নয় ভালোবাসা হৃদয়ে রাখার রাজমুকুট”।   তবু নিজেকে নিজেই ভাঙে আবার গড়েও নেয়।

“আমি ভাবছি, যদি মেয়েরা মা নামের টিপ,
স্ত্রী নামের শিকল, মেয়ে নামের হাতঘড়ি,
বোন নামের চুড়ি-টুড়ি খুলে একদিন দুম করে বলে ফেলে,
‘আমরা কারো হুকুম মানতে নারাজ।’
তখন বাবা নামের গর্ব, ছেলে নামের স্বাধীনতা,
ভাই নামের শাসন, স্বামী নামের হুকুম, এসব হারিয়ে
পুরুষ পুরুষ টাইপ লোকগুলোর মুখের অবস্থা
কীরকম দাঁড়াবে?
ওরা কি তখন, মেয়েরা যা যা সব সহ্য করে তাই করবে?
নাকি রুখে দাঁড়াবে? যদি রুখে দাঁড়ায়,
তবে মেয়েটা শিকল ভেঙে বেশ করেছে।”

হাঁ এ কবিতায় রুদ্র দেখিয়েছে  ভালোবাসার বাইরেও তার বিচরন ক্ষমতা।

ক্র….