সেই রাস্তার কুকুরটা

সেই রাস্তার কুকুরটা

প্রদত্তা মন্ডল 

 

সেই রাস্তার কুকুর টা*

মেঘনা কতদিন ধরে একটা কুকুর বাচ্ছা পুষবো-পুষবো করছে I বাবা রাজি একেবারেই নন I “কুকুর ছানা? সে আবার কী কথা, না না ওসব হবে না I কেন, এত খেলনা তেও হচ্ছে না?” এই তাঁর বক্তব্য I
বাবার কাছে কুকুর পোষা is a nuisance, কিন্তু বাবা কে কিকরে বোঝাবে মেঘনা তার এবার একটা জলজ্যান্ত খেলনা চাই.. তবে এখন মেঘনার পরীক্ষা সামনে এসেছে তাই কুকুর পোষার চাহিদাটা একটু কম। পড়ার দিকে ধ্যান বেশি I সারাদিন শুধু পড়াশোনা I তবে অঙ্ক পরীক্ষার আগের দিন এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটলো I মেঘনা ঘরে পড়ছিলো এমন সময় সে শুনতে পায় একটা বাচ্চা কুকুরের কান্না I ধরমড় করে উঠে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে কুকুরটা রাস্তার পাশে ফুটপাথে পড়ে আছে I মেঘনা এক ছুটে নিচে নেমে গিয়ে রাস্তায় যায় I ফ্ল্যাটে থাকে তো তাই এক হাঁক মারলেই সবাই এসে হাজির হয় I পিঙ্কি, রাই, জয়দাদা সবাই ছুটে রাস্তাতে উপস্থিত I কুকুরছানাটার সারা গা ভর্তি সাদা লোম যেন তুলোর গোলা, ঢুলু ঢুলু চোখ আর বড়ো বড়ো দুটো কান I হ্যা, এমনই তো চেয়েছিলো মেঘনা!!
“এর কী হবে?” জিজ্ঞেস করলো রাই I
“আমি একে পুষবো” উত্তর দিলো মেঘনা I
বেশ তো বলে দিল পুষবে কিন্তু বাবা মানবে না তোঃ! যাইহোক যতক্ষণ না বাবা বাড়ি আসছে ততক্ষন তো রাখলেই হয় I
কুকুর বাচ্চাটাকে দুটি ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দিতেই সে লেজ নাড়তে লাগলো I মা ঘরে বসে বসে তার কারনামা দেখছে I “বাবা ঘরে আসলে কেমন ঝাড় খানিই না দেবে দেখবি! কুকুর টা কে আগে রাস্তা তে ফেলে দিয়ে আয়ে..”
মেঘনা কথা কানেই নেয় না I উফঃ একটা স্বপ্নের কুকুরবাচ্চা পেয়েছে, এত সহজে হাতছাড়া করা যায়?অঙ্ক করবার কথা উচ্ছন্নে তুলে এখন সে কুকুর ছানার সাথে বন্ধুত্ব করতে ব্যস্ত I
“তোর নাম ফুলো হলে কেমন হয় I কি বলিস?”
“ভাউউঃ!!” উত্তর দেন আরেক জন..
ধীরে ধীরে সময়ে কেটে গেলো I বাবার আসার টাইম হয়েছে I কি বলবে বাবাকে? মেঘনা ফুলোর ঘুমন্ত দেহের দিকে তাকায়ে আর ভাবে I আজ কি আবার ওকে ফেলে দিয়ে আসতে হবে রাস্তায়?কিন্তু বাবা আসতে ঘটলো আজব একটা অবাক করা কান্ড.. যে বাবা কুকুরকে এত ঘৃণা করতেন, তিনি ফুলোর মায়া ময়ে চোখ দেখে নরম হয়েগেলেন!! তাঁর বিবেক জেগে বসলো I কেন তিনি এত দিন এমন একটা অমানবিক চিন্তা ভাবনা রাখতেন? সেই কেষ্টোর জীব, ফুলো কে পোষার অনুমতি পেয়ে গেলো মেঘনা I”কোথায় না খেতে পেয়ে মরে যাবে রে I থাক ও…” এই কথাই বললেন বাবা I মেঘনা তো আশ্চর্যিত I বাবা বললো এ কথা?

এই করে অনেক দিন কেটে গেলো I এখন ফুলো বেশ হাড্ডা গোড্ডা আর বড়োসড়ো হয়েছে I মেঘনার রেজাল্ট বার হয়ে এখন গরমের ছুটি চলছে I কি আনন্দ! তারপর আবার কাল মেঘনার জন্মদিন I ছোট মামাও আসছে বিদেশ থেকে! ফোনে কথা হয়েছে, মামা বলেছেন একটা দারুন উপহার আনছেন I কী?
তা বলেননি..

আজ জন্মদিন I ফ্ল্যাট এর সবাই উপস্থিত I সকলে ফুলোকে নিয়ে মেতে রয়েছে I তবে সবথেকে আনন্দ আজ ফুলোর I সারাদিন খুস মেজাজে লেজ নাড়ছে আর কেউ “কেক” বললে কান খাড়া!হটাৎ বেজে উঠলো কলিংবেল I ছুটে গিয়ে দরজা খুললো মেঘনা I
“আরে ছোট মামা!!” খুব আনন্দে বলে উঠলো মেঘনা I
হটাৎ চোখ পড়লো মামার কোলে একটা ছোট বিদেশী এক কুকুর বাচ্চার দিকে I দেখে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে গেলো মেঘনা!!
সবাই ফুলোকে ছেঁড়ে এখন সেই বিদেশী কুকুরটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকলো I কিন্তু মেঘনা কাউকে হাতেই দেবে না..
ফুলোকে কেউ ডাকলই না I ফুলো এদিক ওদিক ভাউ ভাউ করে দেখে ওদের কাছে যেতেই মেঘনা দূরে সরিয়ে দিলো ওকে I
“না রে ফুলো তুই ওকে ছুঁবি না I সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরিস তোর কাছে থাকলে হয়তো ওর অসুখ হবে I তুই দূরেই থাক I যাহঃ চলে যা!!”
ফুলো তো অবাক.. মেঘনা কিকরে এরম বললো? অদৃষ্টের দিকে চেয়ে রইলো ফুলো I ও কি এতটাই তুচ্ছ?!খোলা বারান্দায় শুয়ে রইলো ফুলো, যাকে কেউ একবারটিও মনে করলো না.. ওকে ছাড়াই কেক কাটা হলো I মেঘনার ওকে আর মনেই নেই যে! রাত অনেক হয়েছে I ঘুমানোর সময়ে হয়েছে I কিন্তু আজ ফুলোরি ঘুমানোর চটএর জায়গাতে বিদেশী কুকুর খানার বিছানা পাতা হয়েছে I ফুলো শোবে কোথায়?
দুঃখে, অবিশ্বাসে ফুলো বেরিয়ে নেমে গেলো রাস্তাতে I চারিদিক নিস্তব্ধ I হায় রে, কেমন যেন লাগছে ফুলোর I কেমন যেন একা! রাস্তা পার হতে গিয়ে হটাৎ ধাক্কা দিয়ে দিলো এক লরি ফুলো কে! সারা রাস্তা রক্তে রক্তময়! একি, ফুলো যে মরে গেলো.. যেখানে শুরু হয়েছিল ওর জীবন আজ তো সেখানেই শেষ.. তবে কি তাই? যাইহোক, ও তো রাস্তারই কুকুর I
~ _Miku (মিকু)_